নারায়ণগঞ্জে সৌদি প্রবাসীর স্ত্রী-মেয়েকে গলা কেটে হত্যা : ৩ দিন পর লাশ উদ্ধার
বিজয় নিউজ ২৪ ডটকম : নারায়ণগঞ্জে ফ্ল্যাট বাসা থেকে মা মাবিয়া আক্তার (৪০) ও মেয়ে সাদিয়া আক্তারের (১২) গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত সাদিয়া আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। তার বাবা আহাম্মদ আলী সৌদি প্রবাসী। তিনি সৌদি আরব থেকে গত ৩ দিন ধরে টেলিফোন করলেও স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে কেউই ফোন ধরছিলেন না। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান আহাম্মদ আলী। পরে গতকাল সকালে আহাম্মদ আলী টেলিফোনে তার ছোট ভাই জসিম উদ্দিনকে স্ত্রী-মেয়ের খোঁজ নিয়ে তাকে জানাতে বলেন। জসিম উদ্দিন গতকাল দুপুরে শহরের ৩৮ শাহ সুজা রোডের (পাইকপাড়া) আমেনা মঞ্জিলের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে বড় ভাইয়ের ভাড়া ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। এ সময় ঘরের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। জসিম উদ্দিন বিষয়টি বাড়ির মালিক আবদুল করিম ভূঁইয়া বাবু ওরফে ডিশ বাবুকে জানান। বাবু তালাবন্ধ ঘরের দরজা ফাঁক করে খাটের ওপর একজনের নিথর দেহ দেখে এবং দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি সদর মডেল থানা পুলিশকে জানান। বিকাল ৪টায় পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘরের তালা ভেঙে ফ্ল্যাটের আলাদা আলাদা কক্ষে মা ও মেয়ের গলাকাটা লাশ দেখতে পায়।
ঘটনার খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আশরাফুজ্জামান, সদর মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের, ওসি তদন্ত আবদুর রাজ্জাক, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
মা-মেয়ের ঘাতকদের শনাক্ত করতে পুলিশ লাশ তাত্ক্ষণিক উদ্ধার না করে ঢাকা থেকে সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের ডেকে পাঠায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঢাকা থেকে সিআইডি ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়নি।
নিহত মাবিয়া আক্তার ১৫ বছর ধরে শহরের পাইকপাড়া এলাকায় বসবাস করলেও বছরখানেক আগে ৩৮ শাহ সুজা রোডের আমেনা মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলায় ভাড়া থাকছেন। তার শ্বশুরবাড়ি শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড় বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ টি হোসেন রোড এলাকায়। বাবার বাড়ি সদর থানার ডিক্রিরচর গ্রামে। শ্বশুরবাড়ি নবীগঞ্জে হলেও মাবিয়া মেয়ে সাদিয়াকে নিয়ে পাইকপাড়া এলাকায় আলাদা বসবাস করতেন। সাদিয়া বাড়ির পাশে অবস্থিত আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী ছিল।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, যে বাড়িতে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়, ওই বাড়ির ৫০ গজ দূরেই নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) সাজ্জাদুর রহমানের সরকারি বাসভবন। ওই বাড়িটি কিছুদিন আগেও নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের নামে বরাদ্দ ছিল। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ২ রুমের ফ্ল্যাটে মাবিয়া তার মেয়েকে নিয়ে থাকতেন।
পুলিশের উপস্থিতিতে ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে দেখা গেছে, প্রথম কক্ষের খাটের ওপর অর্ধ টাঙানো মশারির পাশে মুখ ঢাকা অবস্থায় সাদিয়ার গলাকাটা লাশটি পড়ে আছে। সাদিয়ার বুকের ওপর ঘাতকের ফেলে যাওয়া ছুরিটি পড়ে ছিল। আর সাদিয়ার রুমে থাকা স্টিলের আলমারিতে ঝুলছিল চাবি। অন্যান্য আসবাবপত্র পরিপাটি অবস্থায় রয়েছে। সাদিয়ার কক্ষ থেকে বারান্দায় যাওয়ার দরজাটি খোলা। আর বারান্দা দিয়েই পাশের রুমে যেতে হয়। ওই রুমে গিয়ে দেখা গেছে সেখানেও বালিশ দিয়ে মুখ ঢাকা এবং পা বাঁধা অবস্থায় মাবিয়ার গলাকাটা লাশ পড়ে আছে। মাবিয়ার লাশের পাশে পুলিশ একটি লুঙ্গি পড়ে থাকতে দেখেছে।
ফ্ল্যাটটির বারান্দা দিয়ে রাস্তা থেকে যে কেউ অনাসায়েই ফ্ল্যাটটিতে প্রবেশ করতে পারবে।
নিহত মাবিয়ার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন আমেনা খাতুন। তিনি জানান, সোমবার থেকেই তিনি মাবিয়াদের ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ দেখতে পাচ্ছেন। একই কথা জানান চারতলার ভাড়াটে শাবানা বেগম। আমেনা বেগম জানান, সোমবার রাত থেকেই মাবিয়ার ফ্ল্যাট থেকে উচ্চস্বরে গানের আওয়াজ আসতে থাকে।
মাবিয়ার ননদ রৌশন আরা জানান, তাদের (বড় ভাই আহাম্মদ আলীর পরিবার) সঙ্গে কারও বড় ধরনের কোনো শত্রুতা ছিল না। তবে শহরের সেন্ট্রাল চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক নিয়াজের সঙ্গে নবীগঞ্জের একটি মূল্যবান জমি নিয়ে তাদের মামলা চলছিল। এসব কথা বলতে বলতেই রৌশন আরা বিলাপ করছিলেন।
বাড়ির মালিক আবদুল করিম বাবু পুলিশ ও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঘটনাটি কোনোভাবেই ডাকাতির হতে পারে না। কারণ এ বাড়িটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। বাড়ির কেউ দরজা খুলে ঘুমালেও চুরি-ডাকাতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এ ব্যাপারে সদর মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের জানান, প্রথম কক্ষে মেয়ে সাদিয়ার গলাকাটা লাশ পড়ে ছিল। তবে পাশের কক্ষে মা মাবিয়ার লাশটি ছিল পা বাঁধা। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ঘাতক অংশ নিয়েছে। তাছাড়া ঘাতকরা ছিল নিহতদের পূর্বপরিচিত। যে কারণে হত্যাকাণ্ডের আগে কোনো হৈ চৈ বা চিত্কার-চেঁচামেচি হয়নি। তবে ঘটনাটি পরকীয়া, না অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ওসি। তাছাড়া ঘাতকদের ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহের জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের ডাকা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটি ২-৩ দিন আগে ঘটেছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আশরাফুজ্জামান জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনই বলা সম্ভব নয়। অনুসন্ধানেই প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে।









হেফাজতের উদ্দেশ্য ছিল সরকার উৎখাত: তথ্যমন্ত্রী