গণপিটুনি ও পীরালি সংঘর্ষে নিহত ৮ : গণপিটুনিতে ময়মনসিংহে ৪ ও কুষ্টিয়ায় ১ এবং মুরিদদের সংঘর্ষে নরসিংদীতে নিহত ৩
Posted-রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১২ Time-১:০৬ am ◊ বাংলা- ১৪ শ্রাবণ ১৪১৯ সাল ।
বিভাগ-ক্রাইম রিপোর্ট
বিজয় নিউজ ২৪ ডটকম: গণপিটুনি এবং দুদল পীর সমর্থকের ভয়াবহ টেঁটাযুদ্ধে দেশের তিনটি স্থানে ৮ জন নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৬ জন আহত হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৩১ জনকে। মামলা হয়েছে প্রায় ১০০০ জনের বিরুদ্ধে। নির্মম গণপিটুনির ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌর এলাকায়। বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় গণপিটুনিতে নিহত হয় ৪ জন। আহত হয় আরও ৬ জন। তাদের অবস্থাও গুরুতর। অন্যদিকে পীরালির বিরোধকে নিয়ে ভয়ঙ্কর টেঁটার লড়াই হয় নরসিংদীর রায়পুরায়। গতকাল কাশিমপুরী ও চরমোনাইর পীরের সমর্থকরা নিজ নিজ পীর-মতের গ্রহণযোগ্যতা ও এলাকায় আধিপত্য নিয়ে এই রক্তাক্ত যুদ্ধে মেতে ওঠে। একপর্যায়ে টেঁটা নিয়ে পরষ্পরের ওপর উম্মত্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লে এলাকাটি রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়। ও দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে গণপিটুনিতে মারা গেছে এক চোর।শুক্রবার গভীর রাতে ট্রান্সফর্মার চোর সিন্ডিকেটের ১০ সদস্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার নওধার ভটিপাড়া এলাকা থেকে ২টি ট্রান্সফর্মার চুরি করে ট্রাকযোগে ত্রিশাল-বালিপাড়া সড়ক দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের ধাওয়া করে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে চোরবাহিনীর ট্রাকের চাকা পাংচার হলে তারা মালামাল ফেলে পালানোর চেষ্টা করে। এ পর্যায়ে উত্তেজিত কয়েকশ’ এলাকাবাসী তাদের ঘেরাও করে গণপিটুনি দেয়। অন্যদিকে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার কাচারিকান্দি গ্রামে পীরালি মতবিরোধের জেরে টেঁটাযুদ্ধে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে ৩ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়। নিহতরা হলেন, খোকা মিয়া (৩৫), ফারুক মিয়া (১৫) ও এজাজ মিয়া (২৫)। এ ঘটনায় সংঘর্ষের মূল হোতা টেঁটাযোদ্ধা রফিকসহ ২৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এলাকায়। আমাদের ময়মনসিংহ ও ত্রিশাল, নরসিংদী ও কুষ্টিয়া প্রতিনিধির রিপোর্টে বিস্তারিত :
ত্রিশালে গণপিটুনিতে চারজন নিহত পুলিশের মামলা : ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌর এলাকা থেকে গত শুক্রবার রাতে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় বালিপাড়া নামক স্থানে গণপিটুনিতে চারজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৬ জন। পুলিশ আহতদের আটক করে ত্রিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছে। নিহতদের মধ্যে সবুজ (৩০) নামের একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তার বাড়ি ঢাকার সাভারে।
গ্রেফতারকৃতরা হলো-সাভারের ফারুক, নেত্রকোনা জেলা সদরের রানা মিয়া, কেন্দুয়ার মিলন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের হাসান, ফেনীর জামাল ও রাজবাড়ীর সুমন। এদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এ সময় চোর চক্রের ছোড়া ইটের আঘাতে পুলিশের উপ-সহকারী পরিদর্শক শামীম আল মামুন ও কনস্টেবল ক্ষীতিশ চন্দ্র দে আহত হয়েছে। পুলিশ তাদের ব্যবহৃত ট্রাক (বগুড়া-ট-০২-০২১০), ২টি ট্রান্সফর্মার ও ট্রান্সফর্মার কাটার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি জব্দ করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, শুক্রবার গভীর রাতে ট্রান্সফর্মার চুরি সিন্ডিকেট চক্রের ১০ সদস্য ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভার নওধার ভটিপাড়া এলাকা থেকে ২টি ট্রান্সফর্মার চুরি করে ট্রাকযোগে ত্রিশাল-বালিপাড়া সড়ক দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। খবর পেয়ে ত্রিশাল পুলিশের দুটি ভ্যান পেছনে ধাওয়া করে বালিপাড়া নামকস্থানে ব্যারিকেড দেয়। ব্যারিকেড ভেঙে চলে যাওয়ার সময় পুলিশ ট্রাকের চাকায় গুলি করে। গুলিতে ট্রাকের চাকা ফেটে গেলে ট্রান্সফর্মার ছিনতাইকারীরা ট্রাক ফেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে চারিদিক ঘেরাও করে ১০ জনকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ৩ জন মারা যায়। আহত হয় আরও ৭ জন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহত ৩ জনের লাশ উদ্ধার করে এবং ৭ জনকে আহত অবস্থায় আটক করে হাসপাতালে ভর্তি করলে শনিবার সকালে আরাও একজনের মৃত্যু ঘটে।
ত্রিশাল থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার জানান, রাতে পৌর এলাকার এক ব্যক্তি ফোন করে ট্রান্সফর্মার চুরির খবরটি জানালে ত্রিশালের পুলিশের সব মোবাইল টিমকে বিষয়টি নজরে রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। বালিপাড়ায় ওই ট্রাকটিকে সন্দেহ হলে পুলিশ থামাতে চেষ্টা করলে পুলিশের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাওয়ার সময় পুলিশ ট্রাকের চাকায় ৯ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সাহরির সময় বিধায় লোকজন সহজেই ওদের ধরে ফেলে। আটককৃত চারজনকে প্রাথমিক চিকিত্সা শেষে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ত্রিশাল থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ গণপিটুনিতে নিহত চারজনের লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
অজ্ঞাত ৯শ’ জনের নামে মামলা : গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ উপ-পরিদর্শক আবদুল লতিফ ভূঁইয়া বাদী হয়ে শনিবার বালিপাড়া এলাকার অজ্ঞাত ৮-৯শ’ জনের নামে মামলা দয়ের করেছেন। {মামলা নং-২৮(৭)১২}। এছাড়া বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার চুরির দায়ে ত্রিশাল উপজেলার আবাসিক বিদ্যুত্ প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর কবির বাদী হয়ে গ্রেফতার করা ৬ জনের নামে পৃথক মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে এলাকার লোকজনের নামে মামলা হওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রায়পুরায় টেঁটাযুদ্ধ—নিহত ৩,আহত ৪০ : নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলা ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামে ধর্মীয় মতবিরোধকে কেন্দ্র করে কাশিমপুরী ও চরমোনাই পীরের সমর্থকদের দুই গ্রুপের মধ্যে ভয়াবহ টেঁটাযুদ্ধ হয়েছে। এ সময় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে ৩ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন, খোকা মিয়া (৩৫), ফারুক মিয়া (১৫) ও এজাজ মিয়া (২৫)। গতকাল দুপুরে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়তলি ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সংঘর্ষের মূল হোতা টেঁটাযোদ্ধা রফিকসহ ২৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আহতদের রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ নরসিংদী ও পার্শ্ববর্তী জেলা বি-বাড়িয়ার জেলার নবীনগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত খোকা মিয়া কাশিমপুরী পীরের সমর্থক ও কাচারিকান্দি গ্রামের ইসমাইল মিয়ার ছেলে বলে স্থানীয়রা জানান। তবে এ ঘটনায় রায়পুরা থানার ওসি আবদুল বাতেন একজন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
আহতরা হলেন, শহিদ মিয়া, কবির, কমলা বেগম, আল-আমিন, এজাজ মিয়া, কামাল, আবদুল আলী, শাহ আলম, হেলাল মিয়া, ওমর আলী, খোকন মিয়া, সাদেক মিয়া, নজরুল ইসলাম, হারিছ মিয়া, হানিফা মিয়াসহ অন্তত ৫০ জন। আহতদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদরসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, কাচারিকান্দি গ্রামে কাশিমপুরী পীরের সমর্থকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাইফ আলী, করিম মেম্বার, মান্নান মিয়া, অলপত আলী, শুক্কুর আলী ও সুজন মিয়া। চরমোনাই পীরের সমর্থক আলেম গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চরমোনাই মুফতি সাইফুল হাদিস মাওলানা ওসমান গণি, ইসমাইল মেম্বার, হোসেন মেম্বার, আইনুল হোসেন, শিশু মিয়া ও জয়নাল মিয়া। কাশিমপুরী ও চরমোনাই পীরের আলেম গ্রুপের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পীরালি মতবিরোধ চলে আসছিল। এতে দুই পক্ষই এলাকার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই নিয়ে গত শুক্রবার দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।
এরই জের ধরে শনিবার সকালে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। পরে উভয়পক্ষ সংঘবদ্ধ হয়ে টেঁটা বল্লম সহ দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় প্রতিপক্ষের টেঁটার আঘাতে খোকা মিয়া (৩৫), ফারুক মিয়া (১৫) ও এজাজ মিয়া (২৫) নামে ব্যক্তি নিহত হয়। আহত হয় উভয় পক্ষের ৫০ জন। আহতদের উদ্ধার করে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নরসিংদী ও পাশের জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে রায়পুরা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় ২৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভয়াবহ টেঁটাযুদ্ধে ৩ ব্যক্তি নিহত হলেও পুলিশ একজনের কথা স্বীকার করছে।
স্থানীয় পাড়াতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান মাসুদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার চাচাতো ভাই কাউছার মিয়া জানান, শুক্রবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার সকালে গ্রামবাসীরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে খোকা মিয়া নামে এক ব্যক্তি নিহত হলেও আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে এজাজ মিয়া ও ফারুক মিয়া নামে আরও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ব্যাপারে রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল বাতেন জানান, তিনজনের মৃত্যুর খবর আমরাও শুনেছি। কিন্তু আজ (গতকাল) বিকাল পর্যন্ত খোকা মিয়া নামে একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। অন্যদিকে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে নদী দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় সংঘর্ষের মূল হোতা রফিকসহ ২৫ জনকে আটক করার কথা স্বীকার করেন তিনি।
কুষ্টিয়ায় গণপিটুনিতে গরু চোরের মৃত্যু, আটক ১ : গরু চুরি করতে গিয়ে জনতার হাতে আটক হয়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে এক গরু চোর। এ সময় আটক হয়েছে আরও একজন। কুষ্টিয়া কুমারখালীর দবির মোল্লা গেটের কাছে শনিবার ভোরে এ ঘটনা ঘটে।
কুমারখালী থানার ওসি আবদুুর রাজ্জাক জানান, শনিবার ভোরে উপজেলার ছেঁউড়িয়ার মণ্ডলপাড়ার ফরিদ মোল্লার বাড়ি থেকে গরু চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসী চোর চক্রের ২ সদস্যকে আটক করে। এ সময় বাবু ও হাতে আলী ধরা পড়লেও বাকিরা পালিয়ে যায়। সে সময় স্থানীয় জনতা আটক ২ গরু চোরকে গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই বাবু মারা যায় ও হাতেমকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গণপিটুনিতে নিহত বাবুর লাশ উদ্ধার করে জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। রুস্তুমকে আটক করে কুষ্টিয়া মডেল থানায় নিয়ে আসা হয়।
নিহত বাবু সিরাজগঞ্জ জেলার শাহাজাদপুর থানার রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা।









হেফাজতের উদ্দেশ্য ছিল সরকার উৎখাত: তথ্যমন্ত্রী