রক্তচোষা মাছির আক্রমণে জনজীবন অতিষ্ঠ
বিজয় নিউজ ২৪ ডটকম: আফ্রিকায় এক ধরনের রক্তচোষা মাছির উত্পাতে মানুষ ও পশুর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। এগুলো মারাত্মক জীবাণুর বাহক, যা থেকে মানুষ ও জীবজন্তু কেউ নিস্তার পায় না। বিজ্ঞানীরা এই ভয়ঙ্কর প্রাণীটির হাত থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজছেন। পূর্ব আফ্রিকার পর্যটকদের এক বড় আকর্ষণ মাসাই গোত্রের বেদুইনরা। গরুর পাল চরিয়ে বেড়ান তারা। তাদের খাদ্য ও আয়ের প্রধান উত্সই গবাদিপশু। কিন্তু শুধু খরা নয়, ক্ষুদ্র এক ধরনের মাছিও গরুগুলোর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাইরোবির পতঙ্গ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী নুইয়া মানিয়ানিয়া জানান, পতঙ্গরাও মানুষের মতো ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ভাইরাস বহন করে। কিন্তু সব জীবাণু মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। বিশেষ করে, একটি পতঙ্গ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার, যার নাম টেটসে মাছি। এই মাছি নাগানা রোগের বাহক। এই অসুখে বহু জীবজন্তু মারা যাচ্ছে। আফ্রিকায় প্রতি বছর মারা যায় প্রায় ৩০ লাখ গরু। এই রোগ হলে দেখা দেয় রক্তাল্পতা, জ্বরজ্বর ভাব, দুর্বলতা, ল্যাথার্জি, ওজন হ্রাস ইত্যাদি। সংক্রমিত গরুরা শুধু দ্রুতই যে মারা যায় তা-ই নয়, জীবাণু বহনকালে অল্প সংখ্যায় বাছুরের জন্ম দেয়, দুধও হয় কম। এছাড়া মাংসও তেমন পাওয়া যায় না অসুস্থ প্রাণীগুলো থেকে।
কেনিয়ায় টেটসে মাছি দূর করতে নানা রকম উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এখনও গ্রামাঞ্চলে ও জাতীয় পার্কে গবাদিপশুর অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেখানে সর্বত্র জীবাণুনাশক রাসায়নিক দ্রব্য ছিটানো সম্ভব নয়। নানা অসুখের কারণে যেমন প্রতি বছর বহু গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে দারিদ্র্যের হারও।
সম্প্রতি নাইরোবিতে আন্তর্জাতিক পতঙ্গ গবেষণা ইনস্টিটিউট আইসিআইপিই এ সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ আবিষ্কার করেছেন, যা ওয়াটারবাকের মতো গন্ধ ছড়ায়। ওয়াটারবাক আফ্রিকার এক জাতীয় অ্যান্টিলোপ, যে প্রাণীগুলো পানির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে। গবেষকরা লক্ষ করেছেন, গরুর এই গন্ধের সংস্পর্শে আনলে টেটসে মাছি তাদের কামড়াতে আসে না। অন্তত ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে কমে যায় তাদের আক্রমণ। নাইরোবির গবেষণা কেন্দ্রের পশুস্বাস্থ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান রাজিন্দর কুমার সাইনি ৩০ বছর ধরে টেটসে মাছি নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রথম দিকে তিনি ও তার সহকর্মীরা ওয়াটারবাকগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের চোখে পড়ে যে, নাগানা রোগবাহক মাছিরা এই প্রাণীগুলোকে হুল ফোটাতে তেমন আগ্রহী হয় না। গবেষক সাইনির টিম এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ তৈরি করেছেন, যা ওয়াটারবাকের মতো গন্ধ ছড়ায়।
এই গন্ধ মেশানো চেন গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয় গরুগুলোর। এর ফলে সংক্রমিত মাছিগুলো পশুগুলোর কাছে ঘেঁষতে চায় না। ড. সাইনি বলেন, গবাদিপশুর চারণভূমিতেও এই গন্ধ ছড়িয়ে দেয়া যায়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, পশুপালকরা এই পদ্ধতিকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। লক্ষ করা গেছে, এর ফলে গরুর মৃত্যুর হার কমেছে। সংরক্ষিত ও অরক্ষিত এলাকার গরুর পালের মধ্যে স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে একটা বড় পার্থক্যও চোখে পড়ছে।
প্রথম দিকে আইসিআইপিই এই দ্রব্যটি নিজেরাই প্রস্তুত করত। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তাকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্যোগে ২০০৯ সালে প্রতিরোধক দ্রব্যটির জন্য এক বাণিজ্যিক সহযোগী খুঁজে পাওয়া গেছে। তখন থেকে কেনিয়ার এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জীবাণুবাহক টেটসে মাছি বিতাড়ক পদার্থ তৈরির ব্যাপারটি হাতে নিয়েছে। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের একটি কোম্পানি গবেষণা করে দেখতে চায় এই পদার্থ অন্যান্য মাছি দূর করতে কাজে লাগানো যায় কি-না।
উল্লেখ্য, টেটসে মাছির মাধ্যমে স্লিপিং সিকনেস বা নিদ্রারোগের জীবাণু মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়। নিদ্রা রোগটিও আফ্রিকা বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকায় দেখা যায়। মাছি থেকে জীবাণু মানুষের শরীরে ঢুকে স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে চলে যেতে পারে মস্তিষ্কেও। অনেকটা ম্যালেরিয়ার মতো লক্ষণ হলেও রোগটি শনাক্ত করা বেশ কঠিন। এতে মানসিক বৈকল্যও ঘটতে পারে। বিশেষ করে, মধ্য আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এই অসুখ বিস্তৃত। যথাসময়ে ধরা না পড়লে ও চিকিত্সা করাতে না পারলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রোগীরা। সূত্র : ডিডব্লিউ









হেফাজতের উদ্দেশ্য ছিল সরকার উৎখাত: তথ্যমন্ত্রী