Home  » ক্রাইম রিপোর্ট

যশোরে সাংবাদিকসহ একরাতে ৩জন খুন

Posted-শনিবার, ১৬ জুন, ২০১২ Time-৫:৫৮ pm ◊ বাংলা- ২ আষাঢ় ১৪১৯ সাল । বিভাগ-ক্রাইম রিপোর্ট  

বদরুদ্দিন বাবুল বিজয় নিউজ ২৪ ডট কম যশোর থেকে : শুক্রবার রাতে যশোরে সাংবাদিকসহ ৩ জন খুন হয়েছেন। রাত ১২টার দিকে শার্শা উপজেলার কাশিপুর বাজারে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে সাংবাদিক জামাল উদ্দিনকে খুন করে। নিহত জামাল উদ্দিন যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক গ্রামের কাগজের কাশিপুর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। স্থানীয় লোকজন জানান, এলাকায় বিদ্যুত না থাকায় জামাল উদ্দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাশিপুর বাজারে রবির চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এসময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে বাজারের পাশে উপর্যুপরি কুপিয়ে খুন করে। দুর্বৃত্তরা জামালের চোখ তুলে নেয় ও পায়ের রগ কেটে দেয়।

এর আগে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি’র) সোর্স জিয়াউদ্দিনকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে যশোর শহরতলী ঝুমঝুমপুর সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা তাকে পরপর ৫ রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত্যু ঘোষণা করে। নিহত জিয়া উদ্দিন যশোর শহরতলী ঝুমঝুমপুর বিজিবি স্কুল এলাকার আলী হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া। সে কুষ্টিয়া সাদীপুর এলাকার শাহজাহান আলীর ছেলে।

এদিকে শনিবার ভোর ৬টার দিকে অভয়নগর উপজেলার জাফরপুর থেকে কিবরিয়া ফারাজি নামের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তার শরীরে বোমার আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অন্য কোন স্থানে হত্যার পর দুর্বৃত্তরা তার লাশ ওই স্থানে ফেলে রেখে গেছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। অভয়নগর থানার ওসি জানিয়েছেন,  নিহত কিবরিয়া ফারাজির নামে অভয়নগর থানায় একটি হত্যামামলাসহ ৭টি মামলা রয়েছে।

এদিকে বেনাপোলে ডেসটিনি ও গ্রামের কাগজের সাংবাদিককে হাতুড়ি পেটার মাত্র ৩ দিনের মাথায় খুন হলেন যশোর থেকে প্রকাশিত গ্রামের কাগজের সাংবাদিক জামাল উদ্দিন। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শার্শার কাশিপুর বাজারে সন্ত্রাসীরা তার দু’চোখ উপড়ে ফেলে পেটে বলস্নভ মেরে হত্যা করে। খুনিরা তার দু’পায়ের রগও কেটে দেয়। এ সময় বাজার ভর্তি লোক থাকলেও ভয়ে কেউ এগিয়ে যায়নি। সন্ত্রাসীরা বীরদর্পে চলে যাওয়ার পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নাভারণ স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে নেয়। সেখানে আরএমও শহীদ আনোয়ার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় সীমামেত্মর সাংবাদিকদের মধ্যে মৃত্যু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যোগাযোগের চেষ্টা করে ওই রাতে অনেকেরই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। শার্শা থানার ওসি জানান, খুনিদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে।

স্থানীয়রা জানায়, প্রতিদিনের মতো শুক্রবার রাতেও সাংবাদিক জামাল উদ্দিন বেনাপোলের কাশিপুর বাজারে রবির চায়ের দোকানে বসে গল্প করছিলেন। রাত ১১টার দিকে ৮/১০ জনের একদল চিহ্নিত সন্ত্রাসী তাকে তুলে বাজারের পাশে নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পর প্রথমে তার দু’চোখ উপড়ে ফেলে সন্ত্রাসীরা। এরপর পেটে বলস্নভ ঢুকিয়ে তার নাড়িভুড়ি বের করে দেয়। কিন্তু নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়, সন্ত্রাসীরা তার দু’পায়ের রগও কেটে দেয়। এ সময় বাজারভর্তি লোকজন ছিল। অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ছিল খোলা। তবে ভয়ে কেউ টু-শব্দ করেনি। অনেকে দ্রম্নত দোকান পাট বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা খুনিদের নাম প্রকাশে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি সূত্র জানায়, যারা মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ করে তাদের নির্দেশে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও জানে সীমামেত্মর কারা এই খুন করতে পারে। একারণে খুনি ধরতে কারোর সহযোগীতার প্রয়োজন হবে না পুলিশের। কিন্তু পুলিশ কি ধরবে খুনিদের এমন প্রশ্ন অনেকের। তাদের ভাষায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সিন্ডিকেটের গোলামী করে। সময় মতো চুক্তির টাকা পেয়েই খুশি থাকে সংস্থার কর্তা ব্যক্তিরা। এতে সুবিধাও অনেক। রাজনৈতিক চাপ থাকে না, উপরি উপার্জনও হয়। এই টাকা আদায়ে পোর্ট ও শার্শা থানার নিয়োগ করা পাবলিক ক্যাশিয়ার দিন রাত ছুটে বেড়ায় সীমামেত্মর বিভিন্ন স্পটে স্পটে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের কারণে সীমামত্ম এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতরা এক ধরণের গোলামী করে দিন পার করে। এসব কারণে খুনিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে, এমন ধারণা সীমামত্মবাসিদের। তারা বলছেন, ১৩ জুন প্রকাশ্যে বেনাপোলে চলে চোরাকারবারীদের মহড়া। তারা ডেসটিনির সাংবাদিক এমএ রহিমকে তুলে নিয়ে যায় হত্যার উদ্দেশ্যে। পৌরসভায় পুলিশের টহল আর জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীদের উপস্থিতি দেখে সন্ত্রাসীদের মটরসাইকেল থেকে ঝাপিয়ে পড়েন সাংবাদিক রহিম। সেখানেই তাকে হাতুড়ি পেটা করে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা। মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাওয়ার পর স্বজনরা উদ্ধার করে যশোর হাসপাতালে পাঠায়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান রহিম। কিন্তু তাকে দেখতে একবারও হাসপাতালে যাননি সেদিন ঘটনাস্থলে থাকা ক্ষমতাসীন দলের কোনো জনপ্রতিনিধি। তবে এনিয়ে দলটির মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষোভের বহি:প্রকাশও ঘটছে নানাভাবে। কেউ কেউ বলতে শুরম্ন করেছেন জামায়াত পরিবার থেকে ধার করা এক নেতার কারণে শার্শা আ.লীগ অসিত্মত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এই দলটির পৌড় খাওয়া নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করে  আলোচিত এই নেতা একাধিক মামলার আসামী আশা, মোসত্ম, লিয়াকত, শওকতসহ চিহ্নিত কয়েকশ সন্ত্রাসী, চোরাচালানী ও মাদক কারবারীদের দলে ভীড়িয়ে পালস্না ভারী করছেন। তার প্রভাবের কারণে সাংবাদিক রহিম হত্যা প্রচেষ্টার সাথে জড়িত আত্নস্বীকৃত চোরাকারবারীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ তাদের ধরতে সাহস পাচ্ছে না পুলিশ।

সাংবাদিক জামাল হত্যার সাথে জড়িতরাও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে এমন মমত্মব্য  অনেকের। একাধিক সুত্রের বক্তব্য সাংবাদিক রহিমকে হাতুড়ি পেটার মাধ্যমে সাংবাদিকদের মধ্যে পেনিক সৃষ্টির যে চেষ্টা করা হয়েছিল, কার্যত: তা ভেসেত্ম যায়। গর্জে ওঠে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে কর্মরত সাংবাদিকদের কলম। বেরিয়ে আসতে শুরম্ন করে জামায়াত পরিবার থেকে আ.লীগে আসা আলোচিত এই নেতার থলের বিড়াল। এ অবস্থার সামাল দিতে সাংবাদিক জামালকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকে। ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই চান এসব সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হোক। আ.লীগকে জামায়াতির রম্নপ দেয়ার যে অপচেষ্টা শুরম্ন হয়েছে তাও থামিয়ে দেয়ার দাবী জানিয়েছেন দলটির পৌড় খাওয়া স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা। এ উদ্যোগ যত তাড়াতাড়ি নেয়া যাবে শার্শা আ.লীগের জন্য ততো দ্রম্নতই মঙ্গল বয়ে আসবে বলে মনে করেন তারা। সাংবাদিক জামাল হত্যার ঘটনায় খোদ আ.লীগে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে বলেও সুত্রে দাবি করা হয়েছে।

নিহত জামাল উদ্দিন যশোর থেকে প্রকাশিত দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক গ্রামের কাগজের শার্শার কাশিপুর প্রতিনিধির দায়িত্বে ছিলেন। কয়েকদিন আগে এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ে রিপোর্ট করে হুমকির মুখে পড়েন তিনি। মাদক ব্যবসায়ীদের হুমকি-ধামকির এক পর্যায়ে বিষয়টি সহকর্মীদের জানিয়ে রাখার পাশাপাশি থানায় একটি জিডিও করেন তিনি। কিন্তু পুলিশ তার নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যেকারণে তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো পরপারে। সেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসতে পারে না।

নিহত জামালউদ্দিন কাশিপুর গ্রামের আব্দুল আলিমের ছেলে। তিনি ১ ছেলে ও ২ মেয়ের জনক ছিলেন। শার্শা প্রেসক্লাবের সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন সুনামের সাথে। তার এই নৃশংস হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে সহকর্মীদের অনেকে নির্বাক হয়ে যান। পরিবার ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে কাশিপুর বাজার এলাকা। রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান সুহৃদরা।

শার্শা থানার অফিসার ইনচার্জ কেএম ফারম্নক হোসেন জানান, ঘটনার সাথে কারা জড়িত তা এখনও জানা যায়নি। তবে খুনিদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে।

Digg this!Add to del.icio.us!Stumble this!Add to Techorati!Share on Facebook!Seed Newsvine!Reddit!